টাইপোগ্রাফি (Typography) কী?

টাইপোগ্রাফি (Typography) কী?


. 


টাইপোগ্রাফি (Typography) ধারণাটি একেবারে নতুন নয়। বহু যুগের পুরোনোই বলা চলে। আরবি ভাষায় টাইপোগ্রাফিকে আমরা বেশ ভালোই চিনি “ক্যালিগ্রাফি” নামে। তবে বাংলায় ক্যালিগ্রাফির বয়স খুব একটা বেশি নয়। টাইপোগ্রাফি ডিজাইনেরই অন্যতম একটি অংশ। টাইপোগ্রাফির সঠিক ব্যবহার করে ডিজাইনে পরিপূর্ণতা আনা সম্ভব। ডিজাইনের আউটলুক, মুড, ব্যাতিক্রমী মাত্রা কিংবা ক্রিয়েটিভিটি বাড়াতে টাইপোগ্রাফির বিকল্প নেই।

টাইপোগ্রাফি হল অক্ষর কে সাজানোর বিভিন্ন কলাকৌশল। বিভিন্ন ধরনের অক্ষরকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে সাজানোর বলে টাইপোগ্রাফি। ডিজাইনারদের কাছে খুবি পছন্দের একটি বিষয় হল এই টাইপোগ্রাফি। যেমন ধরুন আপনার নিজের নামটাকে লিখলেন।

কিন্তু সোজা ভাবে না লিখে প্রথম অক্ষরটা একটু বড় করে লিখলেন, কিংবা প্রথম অক্ষর টার রং অন্যদের থেকে আলাদা করে দিলেন। কিংবা নামের প্রথম অক্ষরটা ঠিক রেখে বাকীগুলো পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে একটা কলমের আকৃতিতে লিখলেন। লেখার এই কৌশলগুলোকেই একত্রে টাইপোগ্রাফি বলা হয়।

আধুনিক যুগের টাইপোগ্রাফির বৃত্তটা অনেক বড়। এক লাইনে ব্যাখ্যা করি। যেমনঃ

টাইপ ডিজাইনিংঃ টাইপ জিজাইনিং সম্পর্কে সবাই জানে। যেকোন রকমের অক্ষর সাজানোকেই টাইপ ডিজাইনিং বলে।

ক্যালিগ্রাফিঃ অক্ষর চিত্র। এটি প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে। এই পদ্ধতির জন্য দরকার হয় বিশেষ ধরনের তুলি ও কলম| বিশেষ করে চীন ও এরাবিয়ান দেশে বহুল প্রচলিত |

গ্রাফিটিঃ পশ্চিমী আর্ট। এর কোন নির্দিষ্ট নিয়ম নেই। কোনো মিডিয়াম ও নেই। যেভাবে খুশি দুমড়ে-মুচড়ে শব্দকে লেখা যায়| এটি পপ কালচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।

পোস্টার ডিজাইনঃ বিশেষ করে সিনেমার পোস্টার ডিজাইনে যে ধরনের ফন্ট নেওয়া হয় বা ব্যবহার করা হয় |

টাইটেল এনিমেশনঃ সিনেমার প্রথমে বা শেষে কলা-কুশলীদের নাম দেখানোর জন্য এই ধরণের টাইপোগ্রাফিব্যবহার করা হয় |

লোগো ডিজাইনিংঃ লোগো বা প্রতীক বানানোর জন্য ক্ষেত্রে টাইপোগ্রাফির ব্যবহার লক্ষণীয়।

এম্বিগ্রামঃ এম্বিগ্রাম হলো কোন লেখাকে এমনভাবে লেখা যাকে ১৮০ ডিগি ঘুরালেও তা একই রকমভাবেই পড়া যায়।

প্রায় বেশ প্রাচীন কাল থেকেই এই ধরনের গ্রাফের ব্যবহার হয়ে আসছে। প্রাচীন গ্রিসের কিছু প্রিন্টিংয়ে এই ধরনের ডিজাইনের চিহ্ন পাওয়া যায়, এরপর থেকে আজ পর্যন্ত টাইপোগ্রাফের ব্যবহার দিন দিন জনপ্রিয়তার সাথে বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে প্রমোশনের জন্য ব্যবহৃত বিজ্ঞাপনগুলোতে বর্তমানে এর প্রচুর ব্যবহার হচ্ছে।

এখন অবশ্য টাইপোগ্রাফির জন্য বেশ কিছু টুলস পাওয়া যায়।

যেমনঃ typetester.org, fontstruct.com, fonttester.com ইত্যাদি।

তবে ম্যানুয়াল জিজাইনগুলোর কোনো বিকল্প নেই। বিধায় কাজ জানা ডিজাইনারদের ব্যাপক চাহিদা আজও আছে।

শুধু টাইপোগ্রাফি দিয়েই অনেকে সুনাম কামিয়ে নিয়েছে। দু/একটা নামের সাথে পরিচয় করিয়ে দিই। যারা এই ধরনের কাজে বেশ প্রতিভাবান।

Martin Schmetzer: ইনি হাতে একে টাইপোগ্রাফির কাজ করে থাকেন। তার প্রায় সবগুলো কাজই চোখ ধাঁধানো হয়ে থাকে।

Hand Made Font: সংক্ষেপে HMF। এরা মূলত চকলেট সসের উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন টাইপের ফন্ট তৈরি করে থাকে।

BMD Design: প্রায় ২০ বছর ধরে এই কাজের সাথে সম্পৃক্ত। অতএব বুঝতেই পারছেন, বেশ ডিমান্ড নিয়েই কাজ করছেন তারা।

এছাড়াও আরো অনেক অনেক ব্র্যান্ড বা ব্যক্তিত্ব আছেন যারা শুধু এই টাইপোগ্রাফি নিয়েই তাদের ক্যরিয়ার গড়েছেন।

টাইপোগ্রাফির ১০ টি সাধারন বিষয় যা খেয়াল রাখতেই হবে।

(১) প্রয়োজনমত Leading না দেওয়াঃ

Leading বলতে আমরা বুঝি Line spacing. এমন ঘটনা অনেকবারাই ঘটে যখন আমরা কোন বড় আর্টিকেল পড়ি তখন এক লাইন পড়তে গিয়ে আরেক লাইনে চলে যাই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই Leading এর সমস্যার কারনেই আমরা এই সমস্যায় পড়ি।সঠিকভাবে লাইন স্পেচিং সেট করলে আর্টিকেলটি দেখতে যেমন সুন্দর হয় তেমনি পড়তে অসুবিধা হয়না। খেয়াল রাখতে হবে বিভিন্ন ফন্ট এর উচ্চতা বিভিন্ন রকম হয়। সে অনুসারে আমাদের Leading ও কমবেশি করতে হবে আর্টিকেলটিকে সুন্দর করার জন্য।নিচের চিত্রটি দেখুনঃ

(২) পর্যাপ্ত পরিমান Tracking না দেওয়াঃ

Tracking বলতে আমরা বুঝি Letter spacing. কোন একটি শব্দের মধ্যে যে লেটারগুলো থাকে সেগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক দুরত্ব যদি ঠিকমত সেট করা না হয় সেক্ষেত্রে আমরা ডিজাইনটি যখন প্রিন্ট করব তখন একটি Letter এর সাথে আরেকটি Letter কে এক হয়ে হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তখন পড়তে অসুবিধা হয়। তাই Tracking এর দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। নিচের চিত্রটি দেখুনঃ

(৩) Tracking এবং Kerning কে এক করে ফেলাঃ

Tracking এর সম্পর্কে উপরে জেনেছি। আর Kerning হলো যে কোন দুটি Letter এর মধ্যকার দুরত্ব। এমন হলো একটি শব্দের Tracking ঠিক করলাম এরপর কোন কারনে Kerning সেট করতে গিয়ে এমন করে ফেললাম যে একটি প্রথম ৪টি অক্ষরের মধ্যকার দুরত্ব একরকম আর বাকি দুটির মধ্যকার দুরত্ব আরেকরকম। এমনটি করা হলে ডিজাইনটি অসুন্দর হয়। এর প্রতি বিশেষভাবে নজর দিতে হবে। নিচের চিত্রটি দেখুনঃ

(৪) বাক্যকে অনেক লম্বা করে ফেলাঃ

একটি বাক্যে যদি অনেক শব্দ থাকে তাহলে েপাঠক এর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করতে অনেক জটিলতায় পড়তে হয়। এক্ষেত্রে পাঠক বিরক্ত হয় এবং আপনার লেখা থেকে দুরে সরে যায়। এটির প্রতি তার আর কোন আকর্ষন থাকেনা। বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এটা বলা হয়ে থাকে যে কোন বাক্যে ৫০-৬০ টি অক্ষরের বেশি ব্যবহার করা ঠিক নয়। চিত্রটি দেখুনঃ

(৫) খুব বেশিসংখ্যক ফন্ট এবং খুব বেশি ফরমেটিং প্রয়োগঃ

যে কোন একটি পৃষ্ঠায় অথবা একটি প্রজেক্টে অনেকগুলো ফন্টের ব্যবহার পাঠককে বিব্রত করে ফেলে। সেজন্য একটি প্রজেক্টে ২-৩ টি ফন্ট ব্যবহার করুন। আর অনর্থক ফন্টের ওয়েট তথা বোল্ড/আন্ডারলাইন প্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকুন। এতে করে পাঠক কোনটি কম গুরুত্বপূর্ন, কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ন বুঝতে অসুবিধায় পড়েন। এর কারনে হয়তো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ন বিষয়টিও পাঠকের মনোযোগ থেকে বাধ পড়ে যেতে পারে। নিচের চিত্রটি দেখুন-

(৬) লম্বা প্রজেক্টে Serif font ব্যবহার না করাঃ

আমরা সবাই জানি বই, ম্যাগাজিন, পত্রিকা এরকম লম্বা প্রজেক্টের জন্য Serif font সবচেয়ে উপযোগী। কারন এই ফন্টের বেইস লাইন একসমান থাকার কারনে লম্বা আর্টিকেল পড়তে পাঠকের অনেক সুবিধা হয়। তাই লম্বা আর্টিকেলে এই ফন্ট ব্যবহারের প্রতি নজর দিতে হবে।এই ফন্টের ছবি দেখুন, বুঝবেনঃ

(৭) একই মানের কালার অবজেক্ট এবং টেক্সট হিসেবে একটিকে অপরটির উপর ব্যবহার করাঃ

ধরুন একটি অবজেক্ট এর উপর আপনি একটি কালার প্রয়োগ করলেন। সেই অবজেক্ট এর উপর আপনি লিখলেন কাছাকাছি মানের অন্য একটি কালার দিয়ে। অবজেক্ট এর উপর টেক্সটটিকে এনে দেখুন কেমন দেখায়। এই বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। চিত্রটি দেখুন-

(৮) কোন লেখাকে কেন্দ্রে এলাইন করলে সৃষ্ট সমস্যাঃ

কোন একটি লেখাকে যখন আমরা কেন্দ্রে এলাইন করে লিখি তখন এটি প্রায় সময়ই দেখতে অসুন্দর দেখায়। কারন কেন্দ্রে লিখার পর এটি এলোমেলো দেখায়। যার ফলে এটি দেখতে অসুন্দর দেখায়। আপনি ফন্টটি হয়তো খুব ভালো সিলেক্ট করেছেন কিন্তু এডজাস্টমেন্ট, কালার সেটিংস এর কারনে এটি সুন্দর হয়না। এ বিষয়টি নজর দিতে হবে।প্রয়োজনে ট্র্যাকিং ও কার্নিং এডজাস্ট করে লেখাগুলোকে সুন্দর করুন। চিত্রটি দেখুনঃ

(৯) কোন আর্টিকেলের বডি ফন্ট সাইজঃ

ডিজাইনার, নন-ডিজাইনাররা প্রত্যেকেই সাধারনত বডি টেক্সেট এর জন্য ফন্টের ১২ সাইজটি ব্যবহার করে থাকেন। ফন্টভেদে এটি কিছুটা ছোট বড় হতে পারে। তবে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে বডি টেক্সট এ িবেশি বড় সাইজ ভালো দেখায়না। তবে এটা খেয়াল রাখতে হবে মনিটরে লেখাকে আমরা যতটুকু দেখি প্রিন্ট করার পর আরেকটু বড় মনে হবে।আবার প্রিন্টার নির্দেশনা িএরকম যে ফন্ট সাইজ যেন ৭ এর কম না হয়। ৭ এর কম হলে আবার পড়তে সমস্যা হতে পারে।চিত্রটি দেখুন-

(১০) গ্রিড সিস্টেম সম্পর্কে না জানাঃ

আপনি যখন কোন লে-আ্উট ডিজাইন করেন (যেমনঃ পোষ্টার, ব্রশউর, ম্যাগাজিন কভার, বুক কভার, বিজনেস কার্ড , নিউজ লেটার প্রভৃতি) তখন অবশ্যই কোন গ্রিড নিয়ে কাজ করছেন তা খেয়াল রাখবেন এবং ঐ গ্রিড সিস্টেমটা বুঝবেন। এতে করে আপনার টাইপোগ্রাফি প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে এবং আরো দৃষ্টিনন্দন হবে।

উপরের যে তালিকা নিয়ে আলোচনা করলাম আপনাকে সবকিছু মানতে হবে এমন কিন্তু নয়। ডিজাইনের টাইপোগ্রাফি সুন্দর করার জন্য এগুলো ফলো করবেন। আবার আপনার দৃষ্টিতে যদি কোন কমান্ড ডিজাইনকে সুন্দর করে তা প্রয়োগ করতে ভুলবেননা। কারন ডিজাইনতো এটাই। নিয়মমাফিক চলবেন আবার নিজেই নিয়ম ভেঙ্গে নতুন ডিজাইন সৃষ্টি করবেন।

বিঃদ্রঃ অনেক পুরাতন কালেকশন হওয়ায় অরিজিনাল লেখক কে জানা নেই। যদি কে জানেন অবশ্যই ক্রেডিট দিব। অরিজিনাল লেখাকে সংশোধন করে লেখা হয়েছে। ধন্যবাদ।

Reactions

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ